মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে ক্ষোভে প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন নেমে ৩৩ শতাংশে। ওয়াশিংটন পোস্ট–এবিসি নিউজ–ইপসসের সমীক্ষায় প্রতিনিধিসভার নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে আট শতাংশ পয়েন্ট। অর্থনীতি সামলানোর প্রশ্নেও এক দশকের বেশি সময় পরে রিপাবলিকানদের পিছনে ফেলেছে বিরোধী শিবির।

নির্বাচনের আর মাত্র দু’সপ্তাহ বাকি। তার আগেই আমেরিকার রাজনৈতিক হাওয়ায় বড়সড় বদলের ইঙ্গিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাজকর্মের প্রতি জনসমর্থন নেমে এসেছে নতুন সর্বনিম্ন স্তরে। অন্যদিকে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াইয়ে ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভে চাপে রিপাবলিকান শিবির। ওয়াশিংটন পোস্ট–এবিসি নিউজ–ইপসসের সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই ছবি।

আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এখন মাত্র ৩৩ শতাংশ ট্রাম্পের কাজকর্মে সমর্থন জানাচ্ছেন। অসমর্থন করছেন ৬৬ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৫২ শতাংশের বিরোধিতা তীব্র। জুলাইয়ের তুলনায় সমর্থনের হার কমেছে চার শতাংশ পয়েন্ট, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আট। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও তাঁর জনসমর্থন কখনও এতটা নিচে নামেনি। সম্ভাব্য ভোটদাতাদের মধ্যে তাঁর কাজকর্মে সমর্থন রয়েছে ৩৮ শতাংশের, অসমর্থন ৬২ শতাংশের।

শুধু প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তাই নয়, অর্থনীতি সামলানোর প্রশ্নেও ছবিটা বদলাচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় পরে এই প্রথম ডেমোক্র্যাটদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের তুলনায় বেশি ভরসাযোগ্য মনে করছেন ভোটারেরা।

প্রতিনিধিসভার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নে নিবন্ধিত ভোটার ও সম্ভাব্য ভোটদাতা—দুই গোষ্ঠীর মধ্যেই আট শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। জুলাইয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের সমীক্ষায় নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে তাদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান ছিল মাত্র তিন শতাংশ পয়েন্ট।

কংগ্রেসে ট্রাম্পকে রুখতে চান ভোটারেরা?

রিপাবলিকানদের এই বেহাল দশার কেন্দ্রে রয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। সমীক্ষায় ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রেসিডেন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে তাঁরা কি ডেমোক্র্যাট-নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস চান, নাকি তাঁর কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস চান? নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন। রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৩৯ শতাংশ। এক বছর আগের তুলনায় ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ।

সমীক্ষার সামগ্রিক ছবিতে স্পষ্ট, প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা কমছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং সেই সংঘাতের আর্থিক ধাক্কা সরাসরি এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি সামলানোর ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের ওপরই এখন বেশি আস্থা রাখছেন ভোটারেরা।

দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও হতাশা বাড়ছে। আমেরিকার ৭২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে। এপ্রিলের তুলনায় এই হার বেড়েছে পাঁচ শতাংশ পয়েন্ট।

অবশ্য এই সমীক্ষা থেকে নভেম্বরে প্রতিনিধিসভা বা সেনেটের কোনও নির্দিষ্ট আসনে কে জিতবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে প্রচারের শেষ পর্যায়ে কেন রিপাবলিকানদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে হচ্ছে, এমনকি তাঁদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিতেও কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।

রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে খরচ করার মতো মোট অর্থের হিসাবে এখনও এগিয়ে রিপাবলিকানরা। সেই অর্থ দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অনুকূল হাওয়া ঠেকানোর আশা করছেন তাঁরা। কিন্তু সমস্যা হল, এখন দলের তুলনামূলক নিরাপদ আসনগুলির কয়েকটিতে প্রার্থীদের রক্ষা করতেও প্রচারের অর্থ সরিয়ে নিতে হচ্ছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে রিপাবলিকান নেতা ও নির্বাচনী কৌশলবিদদের উদ্বেগ যে বাড়ছে, তা এই সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট।

ভোটকেন্দ্রে যাবেন কারা?

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে কারা ভোট দিতে আসছেন, তার ওপর। সেনেটের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলির অনেকগুলির ফল এখনও অনিশ্চিত। দেশজুড়ে যাঁরা জানিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে ভোট দেবেন অথবা ইতিমধ্যেই ভোট দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা বেশ এগিয়ে। তবে ২০২৪ বা ২০২২ সালের নির্বাচনে যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকানদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। অতীতে ভোট দেওয়ার রেকর্ডও ভবিষ্যতে ভোটদানের সম্ভাবনা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় সাত কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ। তাঁদের মধ্যে এ বার কত জন ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তা এখনও বড় প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছরের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ভোটদানের হার কম থাকে। আর ব্যালটে ট্রাম্পের নিজের নাম না থাকলে তাঁর সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা রিপাবলিকানদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সমীক্ষাতেও সেই ইঙ্গিত মিলছে। নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ৭৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবে ভোট দেবেন অথবা ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ৬৭ শতাংশ।

তবে রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও ফারাক রয়েছে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ বা মাগা আন্দোলনের সমর্থকদের ৭৫ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু মাগা-সমর্থক নন, এমন রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। তাঁদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আবার পরবর্তী কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে দেখতে চান।

ডেমোক্র্যাট শিবিরেও ভোটদানের আগ্রহে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থক ডেমোক্র্যাটদের ৭৯ শতাংশ নিশ্চিতভাবে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। সমাজতন্ত্রপন্থী নন, এমন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার ৭৩ শতাংশ।

অর্থনীতিই ট্রাম্পের বড় কাঁটা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের কাজকর্মের প্রতি জনসমর্থন দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অতীতের নজির অনুযায়ী, প্রতিনিধিসভায় অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা রিপাবলিকানদের এ বার আসন হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। আগামী মাসে ওই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতছাড়া হতে পারে। তবে কতগুলি আসন হাতছাড়া হবে, তা বলা কঠিন। আগের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এ বার দুই দলের মধ্যে হাতবদল হতে পারে, এমন আসনের সংখ্যাও কম।

তবে ট্রাম্পের প্রতি সীমিত অসন্তোষ থাকা ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে পারে রিপাবলিকানরা। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সম্ভাব্য ভোটদাতাদের যে ১০ শতাংশ ট্রাম্পের কাজকর্মকে ‘কিছুটা অসমর্থন’ করছেন, তাঁদের ৫৮ শতাংশ প্রতিনিধিসভার নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে পছন্দ করছেন।

তবু অর্থনৈতিক সমস্যা দলটির সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন নেমে এসেছে মাত্র ২৮ শতাংশে। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে ৪১ শতাংশ। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের এই পর্যায়ে তা ছিল ৪৯ শতাংশ।

মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা প্রায় প্রতি চার জনে তিন জনই অসমর্থন করছেন। অর্থনীতির অবস্থা ইতিবাচক বলে মনে করার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি মানুষ বলেছেন, পরিস্থিতি ‘তেমন ভালো নয়’ অথবা ‘খারাপ’।

এ ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয়ের প্রভাব স্পষ্ট। রিপাবলিকানদের ৫৩ শতাংশ অর্থনীতির অবস্থা ইতিবাচক বলে মনে করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই হার মাত্র ৯ শতাংশ, নির্দলীয়দের মধ্যে ১৬ শতাংশ।

২০২২ সালের এই সময়ে, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন, অর্থনীতি সম্পর্কে মানুষের সামগ্রিক ধারণা প্রায় একই রকম নেতিবাচক ছিল। কিন্তু তখন ৫৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাট অর্থনীতির অবস্থা ভালো বলেছিলেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার ছিল ৮ শতাংশ, নির্দলীয়দের মধ্যে ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ, অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মূল্যায়নে দলীয় আনুগত্যের প্রভাবও কম নয়।

পকেটে টান, ভোটে তার প্রভাব

আর্থিক চাপের প্রভাব কতটা গভীর, তা আরও স্পষ্ট সমীক্ষার অন্য একটি ফলে। প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৮ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ট্রাম্প ফের ক্ষমতায় আসার সময়ের তুলনায় এখন তাঁদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। ১৯৮৬ সাল থেকে ওয়াশিংটন পোস্ট–এবিসির সমীক্ষায় কোনও প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে এমন কথা বলা মানুষের হার কখনও এত বেশি হয়নি।

আর্থিক অবস্থার অবনতির কথা বলা এই ভোটারদের ৭৮ শতাংশ কংগ্রেসের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। নির্দলীয় ভোটারদের মধ্যে এই হার ৭১ শতাংশ।

এই শরতের প্রচারে প্রায় সব প্রার্থীই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং নিত্যদিনের খরচ বহনের সামর্থ্য নিয়ে কথা বলছেন। সমীক্ষা বলছে, পরিবারগুলির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখন পেট্রলের দাম।

ফেব্রুয়ারিতে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে, ৭১ শতাংশ আমেরিকান বলেছিলেন, পেট্রলের দাম তাঁদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের জেরে সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে এবং পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। এখন ঠিক উল্টো ছবি: ৭১ শতাংশের মতে, পেট্রলের দাম তাঁদের সাধ্যের বাইরে।

শুধু জ্বালানি নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, চিকিৎসা এবং বাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচও অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন মত দেওয়া মানুষের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।

বাইরে রেস্তরাঁয় খেতে যাওয়ার খরচ সাধ্যের মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতি ১০ জনে চার জনেরও কম। ফেব্রুয়ারিতে অর্ধেক মানুষ এমনটা মনে করতেন।

ইরান যুদ্ধ, অভিবাসন—সবেতেই ক্ষোভ

ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষের প্রতিফলন রয়েছে তাঁর বিভিন্ন নীতির মূল্যায়নেও। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ করা ভুল হয়েছিল বলে মনে করেন ৬৫ শতাংশ আমেরিকান। মিত্রদেশগুলির সঙ্গে ট্রাম্প যেভাবে আচরণ করেছেন, তা অসমর্থন করছেন ৬৮ শতাংশ।

অভিবাসন নীতি নিয়েও সমর্থন কমেছে। এই প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা প্রায় প্রতি ১০ জনে ছ’জন অসমর্থন করছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের গোড়ায় তাঁর অভিবাসন নীতিতে সমর্থন জানিয়েছিলেন ৫০ শতাংশ মানুষ। এখন ৫৬ শতাংশের মতে, বৈধ নথি নেই এমন অভিবাসীদের দেশ থেকে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে ট্রাম্প বাড়াবাড়ি করেছেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে, বহিষ্কার অভিযান শুরুর সময়, এই হার ছিল ৪৮ শতাংশ।

২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, এমন ভোটারদের একাংশও এখন তাঁর সমালোচক। তাঁদের ২৩ শতাংশ ট্রাম্পের সামগ্রিক কাজকর্ম অসমর্থন করছেন। অর্থনীতি পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা অসমর্থন করছেন ৩১ শতাংশ, মূল্যবৃদ্ধি সামলানোর ক্ষেত্রে ৩৮ শতাংশ।

তবে এই সমালোচকদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, কংগ্রেসের নির্বাচনে তাঁরা রিপাবলিকান প্রার্থীদেরই সমর্থন করেন। কিন্তু ট্রাম্পকে এখনও সমর্থন করেন এমন ভোটারদের তুলনায় এ বছর ভোট দিতে যাওয়ার বিষয়ে তাঁরা অনেক কম নিশ্চিত।

গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলির প্রতিও ট্রাম্পের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তত প্রতি ১০ জনে ছ’জনের মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাক্‌স্বাধীনতা রক্ষা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং কংগ্রেস বা আদালতের কর্তৃত্বকে সম্মান করার ক্ষেত্রে ট্রাম্প যথেষ্ট দায়বদ্ধ নন।

প্রেসিডেন্ট পদে থেকে তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও আপত্তি রয়েছে। ৬৬ শতাংশ মনে করেন, নিজের সম্পদ বাড়াতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদ ব্যবহার করছেন। গত শরতে এই হার ছিল ৫৬ শতাংশ।

ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারের নামের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের চাপ সৃষ্টি করাকে অনুচিত মনে করেন প্রতি ১০ জনে আট জন। তাঁদের মধ্যে ৫৯ শতাংশের মতে, কাজটি ‘সম্পূর্ণ অনুচিত’। ট্রাম্প ও তাঁর নীতির প্রচারে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ খরচকেও অনুচিত মনে করেন ৭৪ শতাংশ মানুষ।

সব মিলিয়ে, ৬৬ শতাংশ আমেরিকানের চোখে ট্রাম্প ‘অতিরিক্ত চরমপন্থী’।

রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের উপরেই ভরসা?

ট্রাম্পকে ঘিরে অসন্তোষের চাপ পড়ছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির ওপরও। অর্থনীতি সামলানোর প্রশ্নে নিবন্ধিত ভোটারদের ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ওপর আস্থা রাখেন, রিপাবলিকানদের ওপর ৩৩ শতাংশ। ওয়াশিংটন পোস্ট–এবিসির সমীক্ষায় ২০১৪ সালের পর এই প্রথম অর্থনীতির প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে গেলেন। এ বছরের এপ্রিল ও জুলাইয়ে এই প্রশ্নে ভোটারদের মতামত প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত ছিল।

মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রেও আস্থার নিরিখে ডেমোক্র্যাটরা দশ শতাংশ পয়েন্ট বা তারও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে।

মজার বিষয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিও মানুষের বিরূপতা কম নয়। আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্কদের ৫৪ শতাংশ দলটিকে অপছন্দ করেন। কিন্তু রিপাবলিকান পার্টির প্রতি বিরূপতা আরও বেশি—৬৩ শতাংশ। রিপাবলিকানদের ৫৫ শতাংশ অতিরিক্ত চরমপন্থী মনে করেন। ডেমোক্র্যাটদের সম্পর্কে এমন ধারণা রয়েছে ৩৬ শতাংশের।

ট্রাম্পের মাগা আন্দোলন এবং এ বছর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করা গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র—দুইয়ের প্রতিই আমেরিকানদের মনোভাব সামগ্রিক ভাবে নেতিবাচক। তবে মাগা আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিরূপতা বেশি: ৬৯ শতাংশের মনোভাব প্রতিকূল। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে এই হার ৫৯ শতাংশ।

প্রতি চার জন আমেরিকানের এক জন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকেই অপছন্দ করেন। কিন্তু এই ‘দুই দলেই বিরক্ত’ ভোটারদের মধ্যেও ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। কংগ্রেসের নির্বাচনে তাঁদের ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন, রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৩২ শতাংশ।

দলীয় ঝোঁকেও বদল

ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বাড়ার আরও একটি ইঙ্গিত মিলেছে আমেরিকানদের দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তনে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের বার্ষিক বেঞ্চমার্ক সমীক্ষা—যা কয়েক মাস ধরে চালানো একটি বিস্তৃত সমীক্ষা—দেখিয়েছে, এ বছরের বসন্তে আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্কদের ৪৭ শতাংশ নিজেদের ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন অথবা ওই দলের দিকে ঝুঁকেছেন। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৩ শতাংশ।

২০২৫ সালে ছবিটা ছিল উল্টো। সে বছর ৪৬ শতাংশ নিজেদের রিপাবলিকান হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বা দলটির দিকে ঝুঁকেছিলেন; ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। ওয়াশিংটন পোস্ট–এবিসি–ইপসসের সমীক্ষায় দলীয় পরিচয়ের অনুপাত পিউয়ের হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে সমন্বয় করা হয়। ফলে সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও দলীয় ঝোঁকের এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়েছে।

সমীক্ষার পদ্ধতি

সমীক্ষাটি ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর অনলাইনে চালানো হয়। সারা দেশের ২,৫৪৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক এতে অংশ নেন। তাঁদের বেছে নেওয়া হয়েছিল ইপসসের ‘নলেজপ্যানেল’ থেকে। এটি আমেরিকার পরিবারগুলিকে নিয়ে গঠিত একটি চলমান সমীক্ষা-প্যানেল, যেখানে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই করা ব্যক্তিদের ডাকযোগে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সামগ্রিক ফলাফলে ত্রুটিসীমা প্লাস-মাইনাস দুই শতাংশ পয়েন্ট। ২,০৩২ জন নিবন্ধিত ভোটার এবং তাঁদের ভিত্তিতে নির্ণীত সম্ভাব্য ভোটদাতাদের ফলাফলে ত্রুটিসীমা প্লাস-মাইনাস ২.২ শতাংশ পয়েন্ট। সম্ভাব্য ভোটদাতাদের ফল নির্ণয়ের জন্য প্রত্যেক নিবন্ধিত ভোটারকে তাঁর ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা অনুযায়ী একটি পরিসংখ্যানগত মান দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটদানে অংশগ্রহণ ও কাকে ভোট দেওয়া হয়েছিল, এবং দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নমুনার ফলও সমন্বয় করা হয়েছে।

সমীক্ষার ফল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে অনুকূল হাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে ভোটদানের হার, পৃথক আসনের পরিস্থিতি এবং শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে আপাতত মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধ এবং অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য বড় নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।